শোনা ও বলার দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল
শোনা ও বলার দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল
শোনার দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল
শোনার দক্ষতা
অর্জনের যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে তার বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করার জন্য আমাদের অবশ্যই
কথ্য ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা দরকার, যা লেখার
দক্ষতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো একটি লেখা বার বার পড়ে তার অর্থ উদ্ধার করা
সম্ভব হয়; কিন্তু কোনো কথা একবার বলা হয়ে গেলে তা আর
শোনার উপায় থাকে না। সুতরাং শ্রোতাকে অবশ্যই বক্তার কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে তার
অর্থ বুঝে নিতে হবে। সাধারণত রেডিওতে বা টেপ করা কোনো বক্তব্যে মিনিটে ১৬০ টি শব্দ
বলা হয়। কিন্তু কথা বলার সময় অথবা আলাপচারিতায় মিনিটে ২২০ টি শব্দ উচ্চারিত হয়ে
থাকে।
আলাপচারিতা
অথবা কোনো কথা বলার সময় শ্রোতা যেন সে কথার তাৎক্ষণিকভাবে মর্মোদ্ধার করতে পারে
সে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য শিশুদের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে সক্ষম করে তোলা যেতে
পারে। একজন বলবে, অন্যজন তা শুনে লিখবে, আর দুজন তা পরিমার্জন করবে, এভাবে যদি
ধারাবাহিকভাবে শিশুদের কাজ দেওয়া যায় তাহলে এ ধরনের কাজ থেকে শিশুরা অবশ্যই শোনা
দক্ষতার উন্নয়ন করতে সক্ষম হবে। এ প্রেক্ষিতে নিচের কাজগুলো বিশেষভাবে অনুশীলন করা
যেতে পারে
🪒 আদেশ/
নির্দেশ পালন করতে দিয়ে।
🪒 গল্প/গল্পের
অংশ শুনিয়ে প্রশ্ন করে তার উত্তর বলতে ও লিখতে দিয়ে।
🪒 সংক্ষিপ্ত
বিবরণ থেকে প্রশ্ন করতে দিয়ে।
🪒 নাটিকা
ও নাট্যাংশ শুনিয়ে বা দেখিয়ে প্রশ্ন করে তার উত্তর বলতে ও লিখতে দিয়ে।
🪒 রেডিও, টিভি ও ক্যাসেট শুনিয়ে প্রশ্ন করে তার উত্তর বলতে ও লিখতে দিয়ে।
🪒 কথোপকথন/
বক্তৃতা শুনিয়ে প্রশ্ন করে তার উত্তর বলতে ও লিখতে দিয়ে।
🪒 কোনো
কিছু শুনিয়ে তার উপর কোনো কাজ সম্পাদন করতে দিয়ে।
বলার দক্ষতা অর্জনের কৌশল
শিশুকাল থেকে
পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়ে শিক্ষার্থীর বলার দক্ষতার উন্নয়ন সাধন করা যায়। এক্ষেত্রে
শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পর্যাপ্ত সহায়তা দেবেন। যেমন-
শিক্ষার্থী যদি পূর্ণবাক্যে অথবা অর্থবহভাবে কোনো কথা না বলে তাহলে অর্থবহভাবে
কথাটি বলে দেবেন। তবে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ভুল শব্দ, বাক্য শুদ্ধভাবে পুনরায় বলবেন। প্রসঙ্গ বহির্ভূতভাবে কোনো শব্দ ব্যবহার
করা হলে প্রসঙ্গ অথবা ক্ষেত্রটি উল্লেখ করবেন।
বলার দক্ষতা অর্জনের কতিপয় কৌশল:
👉 প্রশ্ন করতে ও উত্তর বলতে দিয়ে
👉 ছবি/চিত্রের বিষয়বস্তু বলতে বা
প্রশ্ন করে উত্তর বলতে দিয়ে
👉 গল্প শুনে বলতে দিয়ে
👉 গল্পভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর
বলতে দিয়ে
👉 ছবি সাজিয়ে গল্প বলতে দিয়ে
👉 ছবি দেখে সংলাপ বলতে দিয়ে
👉 অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে দিয়ে
👉 নির্দেশ প্রদান করতে দিয়ে
👉 ছড়া/কবিতা আবৃত্তি করতে দিয়ে
👉 নিজের সম্পর্কে বলতে দিয়ে
👉 ধারাবাহিক গল্প বলতে দিয়ে
👉 উপস্থিত বক্তৃতা করতে দিয়ে
👉 নির্ধারিত বক্তৃতা করতে দিয়ে
👉 উপস্থাপন করতে দিয়ে
👉 খবর পাঠ করতে দিয়ে।
শোনা ও বলা দক্ষতা সমন্বিতভাবে বৃদ্ধির
কৌশল
১.
গল্প বলা:
শিশুদের গল্প
শোনাতে হবে। এক সময় তারা নিজেরাও গল্প বলবে। এভাবে দলে শিশুরা গল্প বলবে এবং একই
গল্প বিভিন্নভাবে কখনও অভিনয় করে, কখনও নাটকীয় ভঙ্গিতে, কখনও বা কথ্য ভাষায় প্রথম পুরুষ ( যেমন আমি ছিলাম দিল্লীর বাদশা,
আমার মন্ত্রী ছিল অতি চালাক...) হিসেবে গল্প বলার অনুশীলন করাতে
হবে। গল্প বলা ও শোনার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য গল্পটি পুনরায় বলার সময় ইচ্ছে করে নাম
ভুল করে, কোনো ভুল তথ্য দিয়ে তা শিশুদের দিয়ে সঠিক নাম
অথবা সঠিক তথ্য শিক্ষকের বলাতে হবে।
২.
কথা বলা:
শোনা ও বলা
দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিশুদের কথা বলতে দেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের
বিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় শিক্ষকগণ শিশুদের কথা বলতে দেন না। সাধারণত শ্রেণিকক্ষে
শিশুদের চুপ করে থাকার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সবাই কথা বললে যে শ্রেণিকক্ষে শোরগোল
হয় তা শৃঙ্খলার পরিপন্থী বলে শিক্ষকগণ মনে করেন। অথচ শিশুর ভাষার প্রকৃত বিকাশ হয়
একে অপরের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে।----- পৃষ্ঠায় উল্লিখিত
উদাহরণ থেকে আমরা দেখেছি শিশুরা কথা বলার মধ্য দিয়ে কীভাবে তাদের চিন্তা ও ধারণাকে
বিকশিত করে থাকে।
৩.
শিশুর কথার মূল্য প্রদান:
শিশুকে দিয়ে কথা বলানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের বিশেষ
ভূমিকা রয়েছে। প্রথমে তাকে উপলব্ধি করতে হবে শিশুরা একে অপরের সাথে কথা বললে তার
ফলাফল কী হয়? দ্বিতীয়ত, শিশুদের
ধারণা, মতামত, পরামর্শ, তথ্যপ্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথোচিত মূল্য দিতে হয়।
শিশুরা কথা
বলার মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, তারা সক্রিয়ভাবে শেখার কাজে
অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের জ্ঞান নিজেরা বিনির্মাণ করে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের
সাবলীলভাবে কথা বলতে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কৌতুহল নিবৃত্ত করা অথবা যেকোনো
প্রশ্নের উত্তর পাওয়া ইত্যাদি বিষয়কে শিক্ষক সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিতে পারেন।
বস্তুত, শিশুর ভাষাদক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবং তাদের জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়ায়
শিক্ষকের ভূমিকা অর্থবহ হতে পারে যদি তারা শিশুদের সাথে একত্রে জ্ঞান লাভ তথা শিখন
প্রক্রিয়ায় একত্রে কাজ করেন। এতে শিক্ষার্থীরা প্রাপ্ত তথ্যের নিহিত অর্থ উপলব্ধি
করতে পারে এবং সাথে সাথে তাদের অভিজ্ঞতাকে স¤প্রসারিত
করতে পারে।
৪.
শিক্ষকের বিশেষ ভূমিকা:
শিক্ষক শিশুর
শোনা ও বলার দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কিছু নির্ধারিত কাজের একজন নিবিড় সহায়ক। শিক্ষক
প্রতিনিয়ত শিশুদের সাথে কথা বলবেন তাদের কথা বলানোর মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা, আবেগ, মতামত ইত্যাদি প্রকাশের সুযোগ দেবেন।
এছাড়া শিশুদের শোনা ও বলার দক্ষতা
বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে-
১. শিশুরা আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলতে পারবে যদি তাদের
কথা বলার ধরন অর্থাৎ কোথায় বলবে ও কখন থামবে ইত্যাদি বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে স্বীকৃতি
দেওয়া হয়।
২. তারা যদি ভুল করে তাহলেও যেন তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ
করে অর্থাৎ মনে করে ভুল তো হতেই পারে। তবে শুদ্ধ কোনটা তা তাদের জেনে নিতে হবে।
৩. ভালোভাবে কথা বলতে পারা যে পড়া ও লেখার মতোই
গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়টি শিশুকে বুঝতে দিতে হবে। প্রয়োজনে তাকে ভালোভাবে কথা বলতে
পারাকে যতদূর সম্ভব উৎসাহিত করতে হবে।
আরও পোস্ট দেখুন
মতামত দিন