সংযোগবাদ : প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি তত্ত্ব

সংযোগবাদ বা প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি তত্ত্ব কী?

১৮৯৮ সালে থর্নডাইক (E. L. Thorndike) তাঁর বিখ্যাত ‘Animal Intelligence’ গ্রন্থে তাঁর সংযোগবাদ মতবাদটি প্রকাশ করেন। সংযোগবাদ তত্ত্বে থর্ণডাইক বলেন, উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নির্ভুল সংযোগের মাধ্যমে শিখন হয়। তাঁর মতে, মানুষ বা প্রাণি কোন বিষয় বার বার প্রচেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমে শিখে থাকে। এই শিখন পদ্ধতিটিকে তিনি বলেছেন প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি (trial and error approach)। প্রচেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমে প্রাণি কীভাবে শিখে থর্নডাইক তাঁর পরীক্ষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। থর্নডাইক বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। তবে তার ক্ষুধার্ত বিড়াল নিয়ে পরীক্ষণটি প্রসিদ্ধ। তিনি এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রসিদ্ধ সংযোগবাদ মতবাদ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

থর্নডাইকের ক্ষুধার্ত বিড়ালের পরীক্ষণ

থর্নডাইক পরীক্ষণের শুরুতে একটি ক্ষুধার্ত বিড়ালকে খাঁচার মধ্যে রেখে একটুকরা মাছ খাঁচার বাইরে এমনভাবে রাখেন যাতে বিড়ালটা মাছটি দেখতে পায়। মাছটি এমন দূরত্বে রাখা ছিল যে, বিড়ালটি খাঁচা খুলে বাইরে আসলেই মাছটি পাবে। খাঁচার দরজাটা একটি ছিটকিনি দিয়ে এমনভাবে আটকানো ছিল যে অল্প চাপ লাগলেই ছিটকিনিটা খুলে যাবে। ক্ষুধার্ত বিড়ালটি প্রথমে খাঁচার ভিতর থেকে মাছটা পাবার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো। বিড়ালটি কখনো খাঁচার মধ্যে ছুটোছুটি, কখনো আঁচড়াতে লাগলো, আবার কখনো কামড়াতে লাগলো।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ও এলোমেলো ভাবে চেষ্টা করতে করতে হঠাৎ ছিটকিনির উপর বিড়ালটির পা লেগে দরজাটি খুলে যায়। বিড়ালটি বাইরে এসে ঐ খাবার খেল। বিড়ালটিকে আবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাঁচার মধ্যে রাখা হলে বিড়ালটি একইভাবে এলোমেলো চেষ্টা করতে করতে হঠাৎ খাঁচার দরজা খুলে খাবারের কাছে পৌঁছাতে সমর্থ হলো। বিড়ালটি প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিন কম ভুল করলো ও অপেক্ষাকৃত কত সময়ে খাঁচা থেকে বেড়িয়ে এলো। তৃতীয় দিনে তার প্রচেষ্টার সংখ্যা আরও কমে এলো এবং পূর্ব দিনের তুলনায় সময় আরও কম লাগল। এইভাবে পরীক্ষণ কাজটা চালিয়ে দেখা গেল যে, এক সময় বিড়ালটির ভুলের সংখ্যা কমে আসছে এবং সময় কম লাগছে। শেষকালে একদিন দেখা গেল বিড়ালটি আর একটাও ভুল প্রচেষ্টা করছে না। যখনই বিড়ালটি বার বার প্রচেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমে উদ্দীপক (ছিটকিনির উপর চাপ) ও প্রতিক্রিয়ার (খাবার খাওয়া) মধ্যে সঠিক সংযোগ স্থাপনে সমর্থ হল, তখনই তার ছিটকিনি খোলার শিখন সমাপ্ত হলো।

থর্নডাইকের প্রাণী সম্পর্কিত গবেষণাগুলো মানুষের শিখন সম্পর্কেও তার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর মতে মানুষ ও প্রাণীর শিখন মূলত একই প্রক্রিয়ায় ঘটে। থর্নডাইক তিনটি মূখ্য নীতি বা সূত্রের মাধ্যমে শিখন কীভাবে হয়-তা ব্যাখ্যা করেন। সূত্র তিনটি হচ্ছে- প্রস্তুতির সূত্র, ফলাফলের সূত্র এবং অনুশীলনের সূত্র।

থর্নডাইকের প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি তত্ত্বের মূখ্য সূত্র কয়টি ও কী কী?

থর্নডাইক তিনটি মূখ্য নীতি বা সূত্রের মাধ্যমে শিখন কীভাবে হয়-তা ব্যাখ্যা করেন। সূত্র তিনটি হচ্ছে-

১. প্রস্তুতির সূত্র (Law of Readiness)

২. ফলাফলের সূত্র (Law of Effect)

৩.অনুশীলনের সূত্র (Law of Exercise)

থর্নডাইকের প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি তত্ত্বের প্রধান সূত্র:

সংযোগবাদ তথা থর্নডাইকের প্রচেষ্টা ও ভূল পদ্ধতি তত্ত্বের প্রধান সূত্র তিনটি। নিম্নে এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

 (১) প্রস্তুতির সূত্র:

থর্নডাইক বলেন, শিখনের প্রথম শর্ত হলো মানসিক প্রস্তুতি। শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি শেখার ই‪ছা, তাড়না(Drive) বা আগ্রহ না থাকে তাহলে সে কোন কিছু শেখার জন্য ব্যস্ত হবে না। ফলে তার শিখন হবে না। শিখনের জন্য উপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াও আরো একধরনের প্রস্তুতি সম্পর্কে শিক্ষকের জানা প্রয়োজন। সেটি হলো পাঠ্যাভাসের প্রস্তুতি। পাঠাভ্যাসের প্রস্তুতি হলো পড়াশুনা শুরুর পূর্বে শিশুর পরিপক্বতা বা পরিণমন উপযুক্ত পর্যায়ে থাকতে হবে। প্রস্তুতি বলতে থর্নডাইক সরাসরি পরিপক্বতার কথা বলেননি। প্রস্তুতি বলতে তিনি প্রস্তুতিমূলক অভিযোজন-কে(Preparatory adjustment) বুঝিয়েছেন।

(২) ফলাফলের সূত্র:

উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ দৃঢ়তর ও স্থায়ী হয় যদি প্রাণীর নিকট তা সন্তোষজনক হয়। বিপরীতে সংযোগের ফল যদি বিরক্তিকর হয় সেক্ষেত্রে সংযোগ দুর্বল হবে। অর্থাৎ প্রাণী সে কাজটি বারবার করে যেটি করে তৃপ্তি বা আনন্দ পাওয়া যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই সূত্রটির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। শিক্ষক পুরস্কার বা সাফল্যের অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিখনকে ত্বরান্বিত করতে পারেন। আবার শাস্তি বা ব্যর্থতার পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনাকাঙ্খিত আচরণকে অপসারণ করতে পারেন।

(৩) অনুশীলনের সূত্র:

অনুশীলন নীতির দ্বারা থর্নডাইক সংযোগ বা অনুষঙ্গ (association) কীভাবে শক্তিশালী বা দুর্বল হয় তা ব্যাখ্যা করেছেন। অনুশীলন বেশি হলে উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ বেশি শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে অনুশীলনের অভাবে উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার সংযোগ দুর্বল হতে থাকে। অনুশীলন নীতি অনুযায়ী শিখন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলে-

ক) প্রতিক্রিয়াটি (কাঙ্খিত শিখন) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং

খ) প্রতিক্রিয়াটি হওয়ার সম্ভাবনা দীর্ঘদিন পরও বর্তমান থাকে বা স্থায়ী হয় ।

সংযোগবাদ তত্ত্বের গৌণ সূত্র কয়টি ও কী কী?

তিনটি মূখ্য সূত্রের সাথে থর্নডাইক আরো ৫ টি গৌনসূত্রের কথা উল্লেখ করেছেন যা মানুষের শিখনের সাথে সম্পর্কিত। সূত্রগুলো হলো-

১. একই উদ্দীপকের উদ্দেশ্যে বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার সূত্র

২. দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক অবস্থার

৩. আংশিক প্রতিক্রিয়ার সূত্র

৪. সদৃশকরণ বা উপমানের সূত্র

৫. অনুষঙ্গমূলক সঞ্চালনের সূত্র।

সংযোগবাদ তত্ত্বের গৌন সূত্রগলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

১. একই উদ্দীপকের উদ্দেশ্যে বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার সূত্র (Law of multiple response to the same stimulus):

এই নীতিতে বলা হয়েছে যে, মানুষ বা প্রাণীসমস্যার সম্মুখীন হলে একটির পর একটিঅর্থাৎ বহুসংখ্যক আচরণ প্রদর্শন করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। যখন সঠিক প্রতিক্রিয়াটি ঘটে তখনই সাফল্য আসে। সমস্যার মুখে প্রাণিটি যদি তার আচরণ পরিবর্তন করতে না পারত, অর্থাৎ বহু ধরনের আচরণের ক্ষমতা যদি তার না থাকত, তাহলে সঠিক প্রতিক্রিয়াটি কোনো দিন ঘটত না।

২. দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক অবস্থার সূত্র (Law of attitude, set of disposition):

শিখন প্রাণীর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা উন্মুখতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই নীতি অনুযায়ী একজন ব্যক্তি কী করবে, কীসে সে আনন্দ পাবে, আর কীসে সে বিরক্ত হবে তা নির্ভর করে তার মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক অবস্থার উপর।

৩. আংশিক প্রতিক্রিয়ার সূত্র (Law of partial activity):

এই নীতি অনুযায়ী একটি সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর বেশি জোর দেয়। অর্থাৎ শিখনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি/পরিবেশের কম গুরুত্বপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বাদ দিয়ে শিক্ষার্থী শুধু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হয়।

৪. সদৃশকরণ বা উপমানের সূত্র (Law of assimilation or analogy):

এটিকে আত্মীকরণের নীতি বা সাদৃশ্যের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়ার নীতি বলা যায়। একটি নতুন পরিবেশে বা পরিস্থিতিতে মানুষ পূর্বে একই ধরনের অবস্থায় যা করেছিল সেসব প্রতিক্রিয়া করবে।

৫. অনুষঙ্গমূলক সঞ্চালনের সূত্র (Law of associative shifting):

এই নীতিতে বলা হয়েছে যে, একটি প্রতিক্রিয়াকে যদি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অপরিবর্তিত রাখা যায় তাহলে সেটিকে শেষ পর্যন্ত একটি নতুন উদ্দীপকের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। যেমন, একটি বিড়ালকে এক টুকরা মাছ দেখিয়ে পেছনের দু’পায়ের উপর দাঁড়াতে শেখানোর পর যদি শুধু ‘দাঁড়াও’ বলা হয় তালেই সে তা করতে শিখে।

শিক্ষক হিসেবে সংযোগবাদ তত্ত্বের আলোকে পাঠদানের গুরুত্ব ও কৌশল

শিক্ষাক্ষেত্রে থর্নডাইকের শিখনের সূত্রসমূহের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে থর্নডাইকের সংযোগবাদ তত্ত্বের গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো:

  • শিখনের প্রতি শিক্ষার্থীর মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি গঠন করা,
  • ফললাভের সূত্র প্রয়োগ করে শিক্ষণীয় বস্তুকে শিক্ষার্থীদের নিকট আনন্দদায়ক ও বোধগম্য করে তোলা। যেমন- স্বীকৃতি প্রদান, উৎসাহ দান, হাস্যজ্বৌল মুখভঙ্গি ইত্যাদি।
  • অনুশীলনের সূত্র প্রয়োগ করে বার বার অনুশীলন করানোর মাধ্যমে তুলনামূলক জটিল বিষয়বস্তু যেমন-নামতা, সংজ্ঞা, কবিতা, বানান শেখানো ইত্যাদি শিখতে সহায়তা করা।
  • পাঠতে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগ বৃদ্ধি করা।
  • জানা থেকে অজানা এবং সহজ থেকে কঠিন বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের অজানা বা কঠিন বিষয় শেখানোর সময় সাদৃশ্যের ভিত্তিতে শিখতে সহায়তা করা।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।