প্যাভলভের চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ তত্ত্ব

প্যাভলভের চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ তত্ত্ব  কী?

চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ (Classical Conditioning) হলো এক ধরনের শিখন যার প্রবর্তক হলেন রাশিয়ান শরীরতত্ত্ববিদ আইভান প্যাভলভ (Ivan P. Pavlov)। যেখানে একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপক দ্বারা একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় যা মূলত: অন্য কোন উদ্দীপক দ্বারা সৃষ্টি হয়। সাপেক্ষীকরণ বা সাপেক্ষ প্রতিবর্তক্রিয়া (Conditioning) বলতে বুঝায় একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপককে (Neutral stimulus) স্বাভাবিক উদ্দীপকের (Unconditioned stimulus) সাথে বার বার সংযুক্ত করলে এক সময় নিরপেক্ষ উদ্দীপকটি নিজেই সাপেক্ষ উদ্দীপকের (Conditioned stmulus) মত কাজ করে এবং সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়াটি করতে সক্ষম হয়।

সাপেক্ষীকরণের মূল ধারণাটি হলো, “পূর্বে যে প্রতিক্রিয়াটি একটি স্বাভাবিক উদ্দীপক দ্বারা সৃষ্টি হত, স্বাভাবিক উদ্দীপকের সাথে অন্য একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপক জুড়ে দেয়ার ফলে নিরপেক্ষ উদ্দীপকটিও এক সময় সেই প্রতিক্রিয়াটি তৈরি করতে সক্ষম হয়, যাকে বলা হয় সাপেক্ষীকরণ।”

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তেঁতুল মুখে দিলে মানুষের জিহ্বায় পানি আসে কিন্তু ঘন্টাধ্বনি শুনে  পানি  আসে  না।  এখানে তেঁতুল  মুখে  দিলে জিহ্বায় পানির  সঞ্চার হওয়া  একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সাপেক্ষীকরণে এমনভাবে  আচরণের  পরিবর্তন  আনা  যায় যেখানে ঘন্টা ধ্বনি  শুনে  মানুষের  জিহ্বায় পানি  আসে।

প্যাভলভের ক্ষুধার্ত কুকুরের পরীক্ষণটির আলোকে চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করুন।

চিরায়ত সাপেক্ষীকরণের (Classical Conditioning) প্রবর্তক হলেন স্বনামধন্য রাশিয়ান শরীরতত্ত্ববিদ Ivan P. Paulov । সাপেক্ষীকরণের মাধ্যমে প্রাণী কীভাবে শেখে তা ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি যে উল্লেখযোগ্য পরীক্ষণটি করেছিলেন তা নিচে বর্ণনা করা হলো:

প্যাভলভের পরীক্ষণ:

 একটি ক্ষুধার্ত কুকুরের উপর প্যাভলভ পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি পরিক্ষণটি করার জন্য পরীক্ষাগারটিকে এমনভাবে সজ্জিত করেন যাতে যান্ত্রিক উপায়ে মাংস কুকুরের মুখে পরিবেশন করা সম্ভব ছিল এবং পরীক্ষক একটি কক্ষ থেকে সবকিছুই দেখতে পেতেন। তবে কুকুরটি পরীক্ষককে দেখতে পেত না। পরীক্ষণের শুরুতে মেট্টোনোম নামক এক ধরনের পরিমাপক ঘড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। কুকুরটিকে প্রথমে ঘন্টা ধ্বনির শব্দ শোনানো হয়। দেখা গেল ঘন্টা ধ্বনির শব্দ শুনে কুকুরটি প্রথমে কান খাড়া করে, তবে লালাক্ষরণ করে না। এক্ষেত্রে ঘন্টা ধ্বনির শব্দটি নিরপেক্ষ উদ্দীপক (Neutral stimulus)। কয়েক সেকেন্ড পরে কুকুরটিকে মাংস দেয়া হলো। দেখা গেল, এখন লালা নির্গত হচ্ছে এবং পরিমাপক বোতলটিতে জমা হচ্ছে। এখানে ক্ষুধার্ত কুকুরটির কাছে মাংস ছিল স্বাভাবিক উদ্দীপক (Unconditioned stimulus) এবং লালাক্ষরণ ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া(Unconditioned response)।

পরীক্ষক এরপর প্রথমে ঘন্টা ধ্বনির শব্দ শোনানোর পর পরই কুকুরটিকে মাংস দেওয়া শুরু করলেন। বেশ কয়েকবার ঘন্টা ধ্বনির শব্দের পর পরই কুকুরটিকে মাংস দেওয়ার এক পর্যায়ে দেখা গেল মাংস না দিলেও শুধুমাত্র ঘন্টা ধ্বনির শব্দ করলেই কুকুরটির মুখ থেকে লালা নির্গত হচ্ছে। এখানে ঘন্টা ধ্বনির শব্দটিই হচ্ছে সাপেক্ষ উদ্দীপক (Conditioned stimulus) এবং এই ঘন্টা ধ্বনির শব্দটিকে মাংসের সাথে উপস্থাপন করে সাপেক্ষীকরণ (Conditioned) করা হয়েছে। পরীক্ষণ অনুসারে ফলাফলটি নিম্নরূপ-

  • স্বাভাবিক উদ্দীপক > স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া
  • নিরপেক্ষ উদ্দীপক + স্বাভাবিক উদ্দীপক > স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া
  • সাপেক্ষ উদ্দীপক > সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া

শিক্ষাক্ষেত্রে চিরায়ত সাপেক্ষীকরণের গুরুত্ব বর্ণনা করুন।

শিক্ষাক্ষেত্রে চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বটির প্রয়োগে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষালব্ধ বিভিন্ন ধরনের অভ্যাস, শিক্ষা, শৃঙ্খলাবোধ ইত্যাদি গঠন করতে সমর্থ হবেন। নীচে চিরায়ত সাপেক্ষীকরণের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:

১. শিশুর ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সাপেক্ষ প্রতিবর্ত ক্রিয়া বা সাপেক্ষীকরণের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো প্রয়োগ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের অভ্যাস অনুশীলন করানো যায়।

২. সাপেক্ষীকরণের মাধ্যমেই শিশু জীবনের শুরুতে বিভিন্ন শব্দ শেখানোর মাধ্যমে ভাষার বিকাশ করা সম্ভব হয়।

৩. শিশুদের অনেক অভ্যাস, যেমন- সকালে ঘুম থেকে ওঠা, বিশেষ সময়ে খাওয়া, পড়তে বসা কিংবা বিছানায় শুতে যাওয়া ইত্যাদি সাপেক্ষীকরণের মাধ্যমেই গড়ে তোলা যায়।

৪. শিক্ষার্থীদের আবেগিক বিকাশের ক্ষেত্রে সাপেক্ষীকরণের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি করা যায়। যেমন- ভয়, ঘৃণা, বিরক্তি, পছন্দ-অপছন্দ প্রভৃতি মনোভাবগুলো সাপেক্ষীকরণের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের আচরণ বা তাঁর শেখানোর পদ্ধতি যদি শিক্ষার্থীর কাছে বিরক্তিকর বা ভীতিকর হয়, তবে ঐ পদ্ধতি বা শিক্ষকের প্রতি যে ভয় তা পাঠ্য বিষয়টিতে সঞ্চালিত হয়।

৫. সু-অভ্যাস গঠনের পাশাপাশি খারাপ অভ্যাস বর্জনের জন্যেও প্যাভলভের সাপেক্ষীকরণ তত্বটির প্রয়োগ করা যায়। যেমন-খারাপ অভ্যাস বর্জনের বা বিলুপ্তির জন্য প্রয়োজন পুরস্কারটি অপসারণ করা।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।