মাশলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব
মাশলোর চাহিদা তত্ত্ব কী?
প্রেষণার বহুল আলোচিত তত্ত্ব হল চাহিদা-সোপান তত্ত্ব। আব্রাহাম মাসলো মার্কিন মনোবিজ্ঞানী মানুষের চাহিদার ঊধ্বর্গামী শ্রেণীবিন্যাসের জন্য তিনি একটি তত্ত্ব পেশ করেন যা ‘Maslow’s hierarchy of needs’ নামে সুপরিচিত। ১৯৪৩ সালে তিনি এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। এ মতবাদটি মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্বের মূলকথা হলো মানুষ প্রথমে তার জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণের চেষ্টা করে এবং তারপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী উচতর চাহিদাগুলো পূরণে সচেষ্ট হয়। মাসলো তাঁর তত্ত্ব চাহিদাগুলোকে পর্যায়ক্রমিকভাবে বিন্যস্ত করেন।
এই তত্ত্বে তিনি মানুষের চাহিদাকে ৫টি ধাপে ভাগ করে দেখিয়েছেন। যথা: জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, স্নেহ-ভালবাসার চাহিদা, আত্মমর্যাদার চাহিদা এবং আত্মপূর্ণতার চাহিদা।
চাহিদা-সোপান তত্ত্ব অনুসারে চাহিদার ধাপ কয়টি ও কী কী বর্ণনা দিন।
মাসলো তাঁর ‘Theory of human motivation’ বইতে ৫টি ধাপের কথা বলেছেন। ধাপগুলো চিত্রসহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

১. জৈবিক চাহিদা:
মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় যে প্রচেষ্টা চালায় তাই মৌলিক চাহিদা। একদম নিচের ধাপটি হলো জৈবিক চাহিদার ধাপ। প্রথমে সে মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা প্রভৃতি পূরণের চেষ্টা চালায় অর্থাৎ এই তত্ত্বে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা ইত্যাদি এই চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। জৈবিক চাহিদার পরিতৃপ্তি না হলে আমরা পরের পর্যায়গুলোতে যেতে পারিনা।
২. নিরাপত্তার চাহিদা:
এটি চাহিদা তত্ত্বের দ্বিতীয় ধাপ। জৈবিক চাহিদা পূরণ হলেই আমাদের মাঝে নিরাপত্তার চাহিদা জাগ্রত হয়। এই চাহিদার মধ্যে রয়েছে আশ্রয়ের নিরাপত্তা, চাকরির নিরাপত্তা, আয় ও সম্পদের নিরাপত্তা, দৈহিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক নিরাপত্তা ইত্যাদি। কারো জৈবিক চাহিদা পূরণের পরে যদি তার নিকট অতিরিক্ত অর্থ থাকে তবে সে প্রথমেই চাইবে তার নিরাপত্তা।
৩. স্নেহ-ভালবাসার চাহিদা:
নিরাপত্তার চাহিদা পূরণ হলে মানুষ ভালোবাসা বা স্নেহের চাহিদা পূরণের জন্য তাড়না অনুভব করে। এই চাহিদা সামাজিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি। এই চাহিদার অভাবে মানুষের মাঝে নিঃসঙ্গতা কিংবা বিষন্নতা দেখা যায়।
৪. আত্মমর্যাদার চাহিদা:
প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আত্মমর্যাদার চাহিদা থাকে। এ পর্যায়ে প্রতিটি ব্যক্তি চায় ভালো চাকরি, দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি প্রভৃতি। অর্থাৎ সে চায় তার সমাজের অন্যান্যদের থেকে নিজেকে একধাপ উপরে রাখতে। মর্যাদাবোধ তখনই আসে যখন মানুষ নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারে। এই মূল্যায়ন যথাযথ না হলে নিজের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যায়, হীনমন্যতায় ভোগে, আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়।
৫. আত্মপূর্ণতার চাহিদা:
প্রথম চারটি ধাপ যথাযথভাবে পূরণ হলেই মানুষ সর্বশেষ চাহিদা অর্থাৎ আত্মপূর্ণতার চাহিদায় যেতে পারে। সবার পক্ষে এ স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ পর্যায়ে ব্যক্তি নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়, নিজের দক্ষতা ও সার্মথ্যের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চায়। তার মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সৃজনশীলতা ও পরিবেশের সাথে পারস্পরিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে। সে নিজেকে ও অন্যকে ভালোবাসে এবং নিজেকে কাজে এমনভাবে নিয়োজিত রাখে যা নৈতিক দিক থেকে সমাজের জন্য কল্যাণকর।
মতামত দিন