সালাত | এর গুরুত্ব ও ফজিলত - Proshikkhon

সালাত | এর গুরুত্ব ও ফজিলত

صلاة| Its importance and virtue

– মোঃ মাহফুযূর রহমান

সালাত/নামাজ কী?

নামাজ/নামায বা সালাত বা সালাহ ইসলাম ধর্মের একটি দৈনিক নিয়মিত ইবাদত। একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করতে হয় যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আছে। এটি মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন অবশ্যকরণীয় একটি ধর্মীয় কাজ। তবে প্রতিদিন আবশ্যকরণীয় বা ফরজ ছাড়াও বিবিধ নামাজ রয়েছে যা সময়ভিত্তিক বা বিষয়ভিত্তিক।

সালাত একটি সুনির্দিষ্ট প্রকৃতির ইবাদত যার পদ্ধতি ‘ইসলামী শরী‘আতে পরিপূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। নামাজ ‘তাকবিরে তাহরিমা’ দ্বারা শুরু হয় ও ‘সালাম ফিরানো’ দ্বারা শেষ হয়’।

“লিসানুল আরব” অনুযায়ী সালাত বা সালাহ (আরবি: الصلوة‎‎ আস-স্বলাহ্, আস-স্বলাত্, আরবি: ٱلصَّلَوَات‎‎ আস-সালাওয়াত, অর্থ “প্রার্থনা”, “দুআ” বা “প্রশংসা”) -এর আভিধানিক অর্থ দুআ, রহমত, ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। কুরআনে ইসলামী আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা হিসেবে সালাত শব্দটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে। আরবি ভাষায় অন্যান্য ধর্মেও এবং ধর্মনিরপেক্ষভাবে প্রার্থনা বা উপাসনা বোঝাতে সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে নামাজ (ফার্সি: نماز‎‎) শব্দটি প্রাচীন ইরান বা পারস্যে প্রচলিত ইন্দো-ইরানীয় আদি আর্য ধাতুমূল নমস্ (নমস্কারও একই ধাতুমূল হতে উদ্ভূত) থেকে ইসলাম পরবতী মধ্যযুগীয় পারস্য বা ইরানে ইসলাম ধর্মের প্রসারের ফলে নিকটবর্তী আরব উপদ্বীপের আরব্য উচ্চারণশৈলীতে বিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়ে ফার্সি ভাষায় প্রবেশকৃত একটি ইসলামী পারিভাষিক শব্দ যা ইসলামী সালাতকে বোঝাতেই মুসলিম ফার্সি সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, এবং কালক্রমে মুঘল শাসনামলে ব্যবহারক্রমে বাংলা ভাষায় পরিগৃহীত হয়েছে। আরবি ভাষার সালাত শব্দের (আরবি: صلاة‎‎, কুরআনিক আরবি: صلاة) ফারসি প্রতিশব্দ নামাজ, যা প্রায় বিগত এক হাজার বছর ধরে ইরানি ও তুর্কি মুসলিম শাসক ও ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষার সাথে সাথে বাংলা ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তুর্কিক ও স্লাভীয় ভাষাতেও নামাজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

লাক ও আভার ভাষাতে, চাক (чак) ও কাক (как) ব্যবহৃত হয়, সালাতের প্রতিশব্দ হিসেবে। মালয়শিয়ায় ও ইন্দোনেশিয়ায়, সোলাত পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি স্থানীয় পরিভাষা, সেমবাহহ্যায়াং ও ব্যবহৃত হয় (অর্থ “the উপাসনাকর্ম”, সেমবাহ – উপাসনা, ও হ্যায়াং – ঈশ্বর বা দেবতা – শব্দ দুটি থেকে)।

ইতিহাস

সালাত / নামাজ ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে দ্বিতীয় রুকন৷ নামাজ প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধি-জ্ঞান সম্পন্ন, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ বা অবশ্যকরণীয়।

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন এবং অব্যবহিত পরে সূরা মু’মিন-এর ৫৫ নম্বর আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী

فَاصْبِرْ اِنَّ وَعْدَ  اللّٰهِ حَقٌّ وَّاسْتَغْفِرْ لِذَنْۢبِكَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ  بِالْعَشِىِّ وَالْاِبْكَارِ

ফাসবির ইন্না ওয়া‘দাল্লা-হি হাক্কুওঁ ওয়াছতাগফির লিযামবিকা ওয়া ছাব্বিহ বিহামদি রাব্বিকা বিল‘আশিইয়ি ওয়াল ইবকা-র।

So be patient (O Muhammad SAW). Verily, the Promise of Allah is true, and ask forgiveness for your fault, and glorify the praises of your Lord in the Ashi (i.e. the time period after the midnoon till sunset) and in the Ibkar (i.e. the time period from early morning or sunrise till before midnoon) [it is said that, that means the five compulsory congregational Salat (prayers) or the ‘Asr and Fajr prayers].

অতএব তুমি ধৈর্য ধারণ কর ; নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি সত্য, তুমি তোমার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর সকাল ও সন্ধ্যায়।

সূরা আল-মুমিন (বিশ্বাসী), সূরা নম্বরঃ ৪০, আয়াত নম্বরঃ ৫৫

৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে রজব তারিখে (২৭শে রজব নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে) ইসরা বা মিরাজের সময় পাঁচওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় যুহর, আসর ও ইশা ২ রাকাত পড়ার বিধান ছিল। পরবর্তীতে ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ২ রাকাত বিশিষ্ট যুহর, আসর ও ইশাকে ৪ রাকাতে উন্নীত করার আদেশ দেয়া হয়।

সালাত/নামাজের গুরুত্ব

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সালাত/নামাজ খুবই প্রিয় ইবাদাত। কালেমার পর নামাজ হল ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ব । জান্নাত লাভের প্রধান উপায় হল সালাত। যারা দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত/নামাজ আদায় করবে পরকালে তাদের স্থান হবে জান্নাতের উত্তম স্থানে। আর যারা নিয়মিত সালাত আদায় করেব না তাদের স্থান হবে জাহান্নাম। হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছন, “সালাত ইসলামের খুঁটি স্বরুপ”। এখন বুঝতে বাকি নেই যে সালাত/নামাজের গুরুত্ব কতটা। খুঁটি ছাড়া যেমন কোন ঘর নির্মাণ করা যায় না ঠিক তেমনি সালাত/নামাজ ছাড়া ইসলাম পূর্ণ হয় না। যে ব্যক্তি সালাত/নামাজ কায়েম করল সে যেন ইসলামের খুঁটিকে শক্ত করল, আর যে সালাত/নামাজে অবেহলা করল সে ইসলামকে ধ্বংস করে দিল।

সালাত/নামাজকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ (বাধ্যতামূলক) করা হয়েছে। আর এমনভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যে এখান থেকে কারো কােনা ক্ষমা (মাফ) নই। একজন যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন তাকে সালাত/নামাজ পড়তেই হবে। সে যদি অসুস্থ্য, অন্ধ, বধিরও হয় তাও তার জন্য সালাত/নামাজ মাফ নেই। শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা সর্বপ্রথম বান্দার নিকট থেকে সালাত/নামাজের হিসাব নিবেন। সেইদিন সালাত/নামাজ আদায়কারী ব্যক্তিকে এমনিতেই চিনতে পারা যাবে। তাদের মুখ, হাত-পা সূর্যের আলোর মত উজ্জল হবে। হাশেরর মাঠে নামাজ আদায়কারীরা থাকবেন নবী, শহীদ ও আলেমদের সাথে। অপরদিকে বেনামাজিরা থাকবে ফিরাউন আর কাফেরদের সাথে।

হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে  শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত সকল নবীদের উপর সালাত/নামাজকে ফরয (আবশ্যক) করা হয়েছিল। কােন কােন নবীদের উপর ৫০ ওয়াক্ত, কখনো ৪০ ওয়াক্ত, কখনো ৩০ ওয়াক্ত, আবার কখেনা ১০ ওয়াক্ত ফরয করা হয়েছিল।  শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে রজব তারিখে ইসরা বা মিরাজে গেলেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ৫০ ওয়াক্ত সালাত/নামাজের বিধান দিয়েছিলেন। পর্যায়ক্রমে নবী (সাঃ) এর অনুরােধে তা ৫ ওয়াক্ত করা হয়। কিন্তু রহমেতর বিষয় হল আখেরী জামানার উম্মতগণ ৫ ওয়াক্ত নামায পড়লেই ৫০ ওয়াক্ত সালাত/নামাজের সওয়াব পাবেন।

সালাত/নামাজের ফজিলত নিয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন “যে সকল ব্যক্তি যত্ন সহকারে সালাত/নামায আদায় করবে তারাই জান্নাতে যাবে এবং অশেষ সম্মানের অধিকারী হবে।

নবী (সাঃ) বলেছেন – “যে ব্যক্তি শুদ্ধ রুপে ওযু করে এবং মনোযোগ সহকারে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সালাত/নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ্ তার জন্য জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দিবেন।”

অর্থাৎ, শেষ বিচারের দিন সালাত/নামাজই ওই ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাবে। উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা নবী করীম (সাঃ) এর সাথে আলাপ চলাকালে নামাজের ওয়াক্ত হয়। তখন তিনি উঠে গেলেন, এবং তার শরীর ও চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। উনার ভাব এমন ছিলো যে উনি আমাকে চিনতেই পারেছেন না। আমি কারণ জানতে চাইলে নবীজী উত্তরে বললেনঃ হে আয়েশা! আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ প্রতিপালনের সময়। প্রত্যেক মুসলিমদের এই আহ্বানে ভয় করা উচিত। নবী (সাঃ) বলেন, যখন কোন বান্দা ওজু করে সালাতে দন্ডায়মান হয় তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা একজন ফেরেশতাকে নির্দেশ করেন আমার ওমুক বান্দা নামাজ আদায় করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কিন্তু তার শরীরে পূর্বের পাপ আছে, তাই তার  শরীরের সমস্ত পাপ তুমি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক, আর আমার বান্দা নিষ্পাপ অবস্থায় সালাত/নামাজ আদায় করুক। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ মোতাবেক ফেরশতা উক্ত ব্যক্তির পাপ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ব্যক্তির নামাজ শেষ হলে ফেরশতা বলে হে আল্লাহ্! আপনার বান্দার নামাজ শেষ হেয়েছ। এখন পাপগুলো তার শরীরে ছড়িয়ে দেই। আল্লাহ্ বলেনঃ আমি হলাম ‘রহমানুর রাহীম’ আমার বান্দার শরীর থেকে পাপের বোঝা নামিয়ে আবার যদি তার শরীরে দিয়ে দেই তাহলে আমার রাহমান নামের স্বার্থকতা থাকেনা। হে ফেরেশতা! যাও আমার এই বান্দার পাপের বোঝা জাহান্নামের আগুনে ফেলে জ্বালিয়ে দাও। এখন থেকে আমার বান্দা নিষ্পাপ। (সুবহানাল্লাহ্)

একদা নবী করীম (সাঃ) সাহাবীদের সাথে বসে ছিলেন। তখন এক ইয়াহুদী নবীজির কাছে এসে বলেলন হে মুহাম্মদ, আপনাকে একটা প্রশ্ন  জিজ্ঞাসা করবো? তবে আপনি যদি তার উত্তর দিতে পারেন তাহলে বুঝবো আপনি সত্যি আল্লাহর নবী। কেননা কোন নবী ব্যতীত কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেব না। তখন নবী করীম (সঃ) বলেলন তোমার প্রশ্ন কি? ইয়াহুদী বলল: আপনার ও আপনার উম্মতের উপর যে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্দিষ্ট করা হয়েছে ইহার কারণ কি? নবী করীম (সাঃ) বলেলন, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে চলে যায় তখন প্রথম আসমানের একদল ফেরশতা আল্লাহর ইবাদাতে লিপ্ত হয়।

ওই সময় সময় আসমানের সকল দরজা খালা থাকে। মানুষ ও ফেরশতাদের ইবাদাত আল্লাহর কাছে পৗেঁছ যায়। যোহেরর সময় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে ইবাদাত কবুল হয়। ওই সময়ে নামাজের আদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য হল উক্ত সময়ে নামাজ পড়িলে শয়তান কোন ধোকা দিতে পারে না। মাগরিবের সময় হযরত আদম (আঃ) এর তাওবা আল্লাহ্‌ কবুল করেছিলেন।

উক্ত সময়ে নামাজ পড়ে আল্লাহর নিকট যাই চাওয়া হয় আল্লাহ্ তাই কবুল করেন। এশার ওয়াক্ত হল এমন এক ওয়াক্ত যা আমার এবং আমার পূর্ববতী নবীদের উপর ও সাহাবাদের উপর এশার নামাজ ফরয ছিল। এই নামাজ পড়িলে সমস্ত নবীদের উপর নির্দিষ্ট নামাযের সওয়াব পাওয়া যায়। আর ফজরের ওয়াক্তের মর্ম হল যখন সূর্য উঠে তখন তা শয়তানের মাথার উপর দিয়ে উঠে ওই সময় কাফের মুশরিকগণ দেব দেবীর উদ্দেশ্যে শয়তানেক সিজদা দেয়।

তাই আল্লাহপাক আমাকে এবং আমার উম্মতগণকে এর আগেই নামাজ পড়ার আদেশ করেছেন। নবীজির উত্তর শুনে সেই ইয়াহুদী বললো, আমি বুঝলাম আপনি সত্যই আল্লাহর নবী। তারপর সই ইয়াহুদী তার দলবল নিয় মুসলমান হয়ে গেল।

নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তুমি যখন নামাজে দাঁড়াব তখন মনে মনে এইরূপ ধারণা করিবে যে তুমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছো, আল্লাহ্ তোমাকে দেখছেন কিন্তু তুমি আল্লাহকে দেখছনা।

সালাত/নামাজের ফজিলত

দুনিয়ার ভালো-মন্দ কর্মগুলো আখিরাতে পরিমাপ করা হবে। দুনিয়ায় যারা বেশি বেশি নেক আমল করবে। তারা কিয়ামতের কঠিন সময়ে সফলকাম হবে। কিয়ামত দিবসে পরিবার-পরিজন কেউ কারো কোনো উপকারে আসবে না। প্রত্যেকে নিজের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সে দিন শুধু দুনিয়ার নেক আমলের ওপর ভরসা করতে হবে। কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا اتَّقُوا اللّٰهَ وَلْتَـنْظُرْ نَـفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ‌ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰهَ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِيْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ

‘তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আল্লাহ পাককে ভয় করো, প্রত্যেকের উচিত লক্ষ করা যে, আগামীকালের জন্য সে কি পেশ করতে যাচ্ছে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাকো; অবশ্যই তোমরা যা কিছু করছ, আল্লাহ পাক তার পূর্ণাঙ্গ খবর রাখেন।’ (সূরা হাশর:১৮, সূরা নম্বরঃ ৫৯, আয়াত নম্বরঃ ১৮)।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে কুরত (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার সালাত/নামাজের হিসাব নেয়া হবে। যদি সালাত/নামাজ ঠিক থাকে তবে অন্যান্য আমলও সঠিক বলে প্রমাণ হবে। আর যদি সালাত/নামাজের হিসাবে গরমিল হয়, অন্যান্য আমলও ত্রুটিযুক্ত হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি-১:২৪৫পৃ.)।

কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’য়ালা সালাত/নামাজ আদায়কারী ব্যক্তিদের প্রতিদান দেবেন। যারা দুনিয়াতে নামাজ কায়েম করেছে, যাকাত প্রদান করেছে, সে দিন তারা আনন্দ-উল্লাস করতে থাকবে। তাদের জাহান্নামের কোনো ভয় থাকবে না। আর দুনিয়ার বেনামাজিরা, সে দিন হা-হুতাশ করতে থাকবে। কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

وَاَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوا الزَّکٰوةَ  ‌ؕ وَمَا تُقَدِّمُوْا لِاَنْفُسِكُمْ مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوْهُ عِنْدَ اللّٰهِ ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ

‘তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত দাও। আর তোমরা নিজেদের জন্য পূর্বে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।’ (সূরা বাকারা, সূরা নম্বরঃ ২, আয়াত নম্বরঃ ১১০)।

اِنَّ الَّذِيْنَ يَتْلُوْنَ كِتٰبَ اللّٰهِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاَنْفَقُوْا مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ سِرًّا وَّعَلَانِيَةً يَّرْجُوْنَ تِجَارَةً لَّنْ تَبُوْرَۙ

‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ্ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না।’ (সূরা ফাতির, সূরা নম্বরঃ ৩৫, আয়াত নম্বরঃ ২৯)।

পরকালে সাফল্যে লাভের চাবিকাঠি হলো সালাত/নামাজ আদায় করা। পরকালে নাজাত পেতে হলে, দুনিয়ার জিন্দেগিতে নামাজের প্রতি যত্নবান হতে হবে। নামাজি ব্যক্তিরাই জান্নাতের স্থায়ী বাসিন্দা হবেন। কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَۙ

الَّذِيْنَ هُمْ فِىْ صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ ۙ

‘নিশ্চয়ই ওই সব ঈমানদার সফলকাম হয়েছে, যারা তাদের নামাজে খুশু-খুজুর সাথে আদায় করে।’ (সূরা মুমিনুন, সূরা নম্বরঃ ২৩, আয়াত নম্বরঃ ১-২)

وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلٰى صَلَاتِهِمْ  يُحَافِظُوْنَؕ

اُولٰٓٮِٕكَ فِىْ جَنّٰتٍ مُّكْرَمُوْنَؕ

‘যারা নিজেদের সালাতের হেফাজত করে, এরাই আল্লাহর জান্নাতে মর্যাদাসহকারে প্রবেশ করবে।’ (সূরা মা’আরিজ, সূরা নম্বরঃ ৭০, আয়াত নম্বরঃ ৩৪-৩৫)।

وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلٰى صَلَوٰتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ‌ۘ

 الْوَارِثُوْنَ ۙ

الَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْفِرْدَوْسَؕ هُمْ فِيْهَا  خٰلِدُوْنَ

‘যারা তাদের সালাতসমূহের হিফাজতকারী, মূলত এরাই হবে জান্নাতুল ফেরদাউসের উত্তরাধিকারী এবং সেখানে তারা স্থায়ীভাবে থাকবে।’ (সূরা মুমিনুন, সূরা নম্বরঃ ২৩, আয়াত নম্বরঃ ৯-১১)।

যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তাদের আমলনামায় কোনো গোনাহ থাকবে না। নামাজ বান্দার আমলনামা থেকে গোনাহগুলোকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেয়।

হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা বলতো, যদি তোমাদের কারো দরজার সামনে একটি নহর থাকে যাতে সে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে, তবে তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবারা উত্তরে বললেন: না, কোনো ময়লাই অবশিষ্ট থাকবে না। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের দৃষ্টান্ত এমনই। এর বিনিময়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা নামাজির সব গোনাহ মাফ করে দেন।’ (বুখারি, হাদীস নং – ৫০৩)।

নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অবহেলা করলে, আখিরাতে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। হজরত নাওফেল ইবনে মুয়াবিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যার এক ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গেল তার যেন ঘরবাড়ি, পরিবার-পরিজন ও ধন-দৌলত সবকিছু ছিনিয়ে নেয়া হলো।’ (ইবনে হিব্বান – ৪:৩৩০ পৃ.)।

সালাত/নামাজের গুরুত্ব এতটাই যে, মুসলমান ও অন্য ধর্মের লোকদের মধ্যে পার্থক্যই হলো নামাজ। হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের শিরক এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য নামাজ ছেড়ে দেয়া।’ (মুসলিম, হাদীস নং – ২৪৭)।

হজরত হানজালা উসাঈদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথ পাবন্দীর সাথে আদায় করে, উত্তমরূপে অজু করে, সময়ের প্রতি খেয়াল রাখে, রুকু-সিজদা ঠিকমতো আদায় করে এবং এভাবে নামাজ আদায়কে নিজের ওপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার হক মনে করে, তবে জাহান্নামের আগুন তার জন্য হারাম করে দেয়া হবে। (মুসনাদে আহমাদ-৪: ২৬৭পৃ.)।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করার জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা সবাইকে তৌফিক দান করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. উইকিপিডিয়া

২. দৈনিক নয়া দিগন্ত

আরও পোস্ট দেখুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!