সালাতের আহকাম ও আরকান - Proshikkhon

সালাতের আহকাম ও আরকান

صلاة| Ahkam and Arkan of Salah

– মোঃ মাহফুযূর রহমান

সালাতের ফরয

সালাতের ফরজ হল ১৩ টি যেগুলোর কোন একটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিলে সালাত / নামাজ আদায় শুদ্ধ হবে না। অর্থাৎ সালাত শুরুর পূর্বে ৭টি আহকাম (أحكام) আর সালাতের মধ্যে ৬টি আরকান (اركان) রয়েছে সেগুলোকে সালাত বা নামাজের ফরজ বলা হয়।

সালাতের আহকাম ও আরকান কী?

সালাত শুরুর পূর্বের ফরজসমূহকে আহকাম অন্যদিকে যে ফরজ কাজগুলো সালাতের মধ্যে আদায় করতে হয়, সেগুলোকে সালাতের আরকান বলা হয়। প্রথমে আমরা সালাত / নামাজের আহকাম সম্পর্কে আলোচনা করা হল:

ক) সালাতের আহকামসমূহ (أحكام):

আহকাম শব্দটি বহুবচন, একবচনে হুকুম। যে ফরজ কাজগুলো নামাজ শুরু করার আগেই করতে হয়, সেগুলোকে সালাতের আহকাম বলা হয়। সালাতের আহকাম মোট সাতটি। নিম্নে সালাত / নামাজের আহকামসূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করা হল:

১) শরীর পবিত্র হওয়া:

সালাত নামাজ আদায় করার জন্য শরীর পাক-পবিত্র হতে হবে। গোসল, অযু বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। শরীর পবিত্র হওয়ার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ বলেন, সালাত /  নামাজ আদায়কারীর শরীর পবিত্র হওয়া। (বুখারি, হাদিস নং – ২৯৬)। পবিত্রতা অর্জন ছাড়া সালাত / নামাজ শুদ্ধ বা সহিহ হবে না। (বুখারি, হাদিস নং – ৬৪৪০)।

২) কাপড় পবিত্র হওয়া:

সালাত/ নামাজ আদায়কারীর কাপড় পবিত্র হতে হবে, অর্থাৎ কাপড়  বা পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। এই বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

وَثِيَابَكَ  فَطَهِّرْۙ

তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ।

(সূরা মুদ্দাসসির, সূরা নম্বরঃ ৭৪, আয়াত নম্বরঃ ৪)।

৩) জায়গা পবিত্র হওয়া:

যে স্থানে  সালাত / নামাজ পড়া হবে ওই স্থানটি পবিত্র হতে হবে। জায়গার সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো দুই পা, দুই হাত, হাঁটু এবং কপাল রাখার স্থান। ন্যূনতম এটুকু স্থান পবিত্র হতে হবে। এই বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

وَاِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَاَمْنًا ؕ وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ اِبْرٰهٖمَ مُصَلًّى‌ ؕ وَعَهِدْنَآ اِلٰٓى اِبْرٰهٖمَ وَاِسْمٰعِيْلَ اَنْ طَهِّرَا بَيْتِىَ لِلطَّآٮِٕفِيْنَ وَالْعٰكِفِيْنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوْدِ

এবং সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন আমি কা’বাগৃহকে মানব জাতির মিলন কেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, ‘তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর।’ এবং ইব্রাহীম ও ইস্মাঈলকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকূ’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখিতে আদেশ দিয়াছিলাম। (সূরা আল বাকারাহ, সূরা নম্বরঃ ২, আয়াত নম্বরঃ ১২৫)।

৪) সতর ঢেকে রাখা:

অবশ্যই সতর ঢাকা থাকতে হবে। নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই সতর ঢাকা থাকতে হবে। এই বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

يٰبَنِىْۤ اٰدَمَ خُذُوْا زِيْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَّكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا‌ ۚ اِنَّهٗ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ

হে বনী আদম ! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করিবে, আহার করিবে ও পান করিবে কিন্তু, অপচয় করিবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা আ’রাফ, সূরা নম্বরঃ ৭, আয়াত নম্বরঃ ৩১)।

পুরুষের সতর হল নাভির উপর থেকে হাঁটুর নিচ (টাখনুর উপরে) পর্যন্ত, আর নারীর সতর হল মুখমণ্ডল, দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের পাতা ব্যতীত সারা শরীর। নামাজের শুরু থেকেই যদি সতরের এক-চতুর্থাংশ উন্মুক্ত থাকে তখনো নামাজ হবে না। নামাজ পড়াকালীন এক রুকন আদায় করার সময় পর্যন্ত যদি সতর খোলা থাকে তাহলে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ২/৪৫১, বাদায়ে ১/৪৭৭)

৫) কিবলা মুখী / কাবামুখী হয়ে দাঁড়ানো:

কিবলামুখী হওয়া (কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা)। তবে অসুস্থ এবং অপারগ ব্যক্তির জন্য দাঁড়িয়ে সালাত / নামাজ আদায় করার এই শর্ত শিথিলযোগ্য। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ কিবলামুখী হয়ে নামাজ না পড়ে, তার নামাজ হবে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ  شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَـرَامِؕ وَاِنَّهٗ لَـلْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَؕ وَمَا اللّٰهُ بِغَافِلٍ عَمَّا  تَعْمَلُوْنَ وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَـرَامِؕ وَحَيْثُ مَا كُنْتُمْ فَوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ شَطْرَهٗ ۙ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَيْكُمْ حُجَّةٌ اِلَّا الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا مِنْهُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِىْ وَلِاُتِمَّ نِعْمَتِىْ عَلَيْكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ ۙ‌ۛ

যেখান হইতেই তুমি বাহির হও না কেন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও। ইহা নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে প্রেরিত সত্য। তোমরা যাহা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ্ অনবহিত নহেন। তুমি যেখান হইতেই বাহির হও না কেন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক না কেন উহার দিকে মুখ ফিরাইবে, যাহাতে তাহাদের মধ্যে জালিমদের ব্যতীত অপর লোকের তোমাদের বিরুদ্ধে বিতর্কের কিছু না থাকে। সুতরাং তাহাদেরকে ভয় করিও না, শুধু আমাকেই ভয় কর। যাহাতে আমি আমার নিয়ামত তোমাদেরকে পূর্ণরূপে দান করিতে পারি এবং যাহাতে তোমরা সৎপথে পরিচালিত হইতে পার।

(সূরা আল বাকারাহ, সূরা নম্বরঃ ২, আয়াত নম্বরঃ ১৪৯ – ১৫০)।

কিবলা হলো সরাসরি কাবাঘর। সেদিক হয়েই সালাত / নামাজ পড়তে হবে। এটি মক্কার বাসিন্দাদের জন্য, যারা সরাসরি কাবা শরিফ দেখে দেখে সালাত / নামাজ পড়তে সক্ষম। (বুখারি, হাদীস নং – ৩৮৩)। অথবা কাবার দিকে ফিরে সালাত / নামাজ পড়বে। এটি সেসব লোকের জন্য, যারা কাবাঘর সরাসরি দেখতে পারছেন না। যারা মক্কা মুকাররামা থেকে দূরে অবস্থান করে তাদের জন্যও কাবার দিক হয়ে সালাত / নামাজ পড়া আবশ্যক। যদি কেউ রোগের কারণে বা শত্রুর ভয়ে কাবার দিক হয়ে সালাত / নামাজ পড়তে অক্ষম হয়, তাহলে সে যেদিকে সালাত / নামাজ পড়তে সক্ষম সেদিক হয়ে সালাত / নামাজ পড়তে পারবে। (বুখারি ৩৮৮, হাদীস নং – ৪১৭১)। আবার কিবলার দিক কোনটি তা যদি জানা না থাকে, সে যদি কোনো বিল্ডিং এর ভিতরে থাকে অথবা নিকটে কোনো মানুষ পায়, তবে তার উচিত হবে জিজ্ঞাসা করে জানার চেষ্টা করা। অথবা মসজিদের মেহরাব, কম্পাস, চাঁদ সূর্যের অবস্থান ইত্যাদির মাধ্যমে কিবলা নির্ণয়ের চেষ্টা করা। পরিশেষে ব্যর্থ হলে যান্নে গালেব তথা প্রাধান্যপ্রাপ্ত ধারণার ওপর নির্ভর করে নামাজ আদায় করে নেয়া। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ

অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো। (সূরা আত-তাগাবুন, সূরা নাম্বার: ৬৪, আয়াত নাম্বারঃ ১৬ [অংশ])

৬) ওয়াক্ত অনুযায়ী সালাত আদায় করা:

সালাত / নামাজের ওয়াক্ত হওয়া ছাড়া নামাজ শুদ্ধ হবে না। তাই সালাত / নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। অনিশ্চিত হলে সালাত / নামাজ হবে না, যদি তা ঠিক ওয়াক্তেও হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কুরআন আল কারীমে বলেন,

فَاِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلٰوةَ فَاذْكُرُوا اللّٰهَ قِيَامًا وَّقُعُوْدًا وَّعَلٰى جُنُوْبِكُمْ  ۚؕ فَاِذَا اطْمَاْنَنْتُمْ فَاَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ‌  ۚ اِنَّ الصَّلٰوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتٰبًا مَّوْقُوْتًا

যখন তোমরা সালাত সমাপ্ত করিবে তখন দাঁড়াইয়া, বসিয়া এবং শুইয়া আল্লাহ্‌কে স্মরণ করিবে, যখন তোমরা নিরাপদ হইবে তখন যথাযথ সালাত কায়েম করিবে; নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মু’মিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। (সূরা আন নিসা, সূরা নম্বরঃ ৪, আয়াত নম্বরঃ ১০৩)।

সালাতের সময়

১. ফজরের নামাজের সময় : সুবেহ সাদেক- র্অথাৎ পূর্বদিগন্তে যে শুভ্রতা দেখা যায়- থেকে সূর্যোদয় র্পযন্ত।

২. যোহরের সময় : সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত।

৩. আসরের সময় : যোহরের সময় শেষ হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

৪. মাগরিবের সময় : সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে শফকে আহমার শেষ হওয়া পর্যন্ত। শফকে আহমার হলো সূর্যাস্ত যাওয়ার সময় পশ্চিমাকাশে যে লাল আভা থাকে তা।

৫. এশার সময়: মাগরিবের সময় শেষ হওয়ার পর থেকে সুবেহ সাদেক উদয় হওয়া পর্যন্ত। ইমামদের কারো কারো কাছে মধ্য রাতে এশার সময় শেষ হয়ে যায়। তাদের দলিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস,«এশার নামাজের সময় মধ্যরাত পর্যন্ত।»(বর্ণনায় মুসলিম)

বর্তমানযুগে ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে নামাজের সময় খুব সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। সালাত/ নামাজের ওয়াক্ত নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ বলেন-

“যে ব্যক্তি নামাজের ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পূর্বে মাত্র এক রাকাত নামাজ পেল সে ওই নামাজ পেয়ে গেল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ বলেন, «যে ব্যক্তি নামাজের এক রাকাত পেল সে ওই নামাজ পেয়ে গেল।” -বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম।

“যদি কারও ঘুমের কারণে নামাজ ছুটে গিয়ে থাকে অথবা মনে না থাকার কারণে নামাজ ছুটে গিয়ে থাকে, তবে জাগ্রত হওয়া ও মনে পড়ার সাথে সাথে তা আদায় করে নিতে হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন, «যে ব্যক্তি কোনো নামাজ ভুলে গেল, স্মরণ হলে সে যেন তা আদায় করে নেয়।” আর এটাই হলো তার কাফ্ফারা। -বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম।

সালাতের মাকরূহ সময়

সালাত / নামাজের মাকরূহ সময় তিনটি অর্থাৎ এই সময়গুলোতে নামাজ পড়া নিষেধ। সেগুলো হল:

১) সূর্যোদয়ের পর থেকে এশরাকের আগ পর্যন্ত:

সূর্য উঠার শুরু থেকে হলুদ আলো পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত সময়টুকুতে সব ধরনের নামাজ পড়া নিষেধ। ফকিহরা গবেষণা করে দেখেছেন সূর্য উঠার পর হলুদ আলো দূর হতে ২০ মিনিট সময় লাগে। অর্থাৎ আবহাওয়া অফিস যদি বলে, সকাল ছয়টায় সূর্য উঠবে, তার মানে ৬টা ২০ পর্যন্ত সব ধরনের নামাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

২) সূর্য যখন মাথার ওপরে:

সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে থাকে তখনও সব ধরনের নামাজ এবং সেজদা করা নিষেধ। আরবি ভাষায় এ সময়কে ‘জাওয়াল’ বলে। যখন সূর্য একটু হেলে পড়বে তখন জোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। এ সময় সব ধরনের নামাজ এবং সেজদা করা জায়েজ। সূর্য মাথার ওপর থেকে হেলে পড়তে বেশি সময় লাগে না। ফকিহরা সতর্কতাবশত সূর্য মাথার ওপরে উঠার পাঁচ মিনিট আগে এবং পাঁচ মিনিট পর পর্যন্ত নামাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

৩) সূর্য ডোবার সময়:

সূর্য যখন হলুদ বর্ণ ধারণ করে ডুবতে শুরু করে তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত সব ধরনের নামাজ পড়া নিষেধ।

সাহাবি উকবা বিন আমের আল জুহানি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ্ আমাদের তিন সময়ে নামাজ এবং মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করেছেন। ১. সূর্য উঠার সময়, যতক্ষণ না তা পুরোপুরি উঁচু হয়ে যায়। ২. সূর্য যখন মাথার ওপর ওঠে তখন থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ার সময়টুকু। ৩. এবং সূর্য হলুদবর্ণ হওয়ার পর থেকে ডোবার আগ পর্যন্ত।’ (বুখারি, হাদীস নং – ৫৫১ এবং মুসলিম, হাদীস নং – ১১৮৫)।

এ তিন সময় নামাজ পড়া নিষেধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে জ্ঞানীরা বলেন, সূর্য যখন ওঠে, যখন মাথার ওপর ওঠে এবং যখন ডুবে যায়- এ তিন সময় সূর্য পূজারিরা সূর্যকে সেজদাহ করে। তখন কেউ যদি নামাজ পড়ে তাহলে তাকেও সূর্য পূজারি মনে হতে পারে। এ জন্য এ সময় সব ধরনের নামাজ পড়া এবং সেজদাহ করা ইসলামী শরিয়ত মাকরুহে তাহরিমি তথা নিষেধ মনে করে।

মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানাভী (রহ.) বলেন, এ তিন সময়ে নামাজ তো দূরের কথা এমনকি তিলাওয়াতে সেজদাহ করাও নিষেধ। জানাজার নামাজ এবং মৃতকে দাফন করাও নিষেধ। তবে মৃতকে তাড়াতাড়ি দাফন করার প্রয়োজন হলে জানাজা পড়িয়ে দাফন করার অনুমতি আছে।

৭) নিয়ত করা:

নিয়ত ছাড়া সালাত / নামাজ সহিহ হবে না। ফরজ সালাত / নামাজ হলে কোন সময়ের সালাত / নামাজ, তা নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। যেমন – যুহর অথবা আসরের সালাত / নামাজ। সেরূপ ওয়াজিব নামাজ হলে তাও নির্দিষ্ট করা জরুরি। যেমন – সালাতুল বিতর নামাজ বা সালাতুল ঈদ ইত্যাদি। কিন্তু নফল সালাত / নামাজে নির্দিষ্ট করে নিয়ত করার প্রয়োজন নেই। তখন শুধু সালাত /  নামাজের নিয়ত করলেই হবে। কেননা ফরজ ও ওয়াজিব সালাত সালাতের সময় বা প্রকার হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন। সে কারণে তা নির্দিষ্ট করে নিয়ত করতে হবে। (বুখারি, হাদিস নং – ১,  আল আশবাহ : ১/৪৩)। জামাতে সালাত / নামাজ হলে মুক্তাদিদের ইমামের অনুসরণের নিয়ত করা আবশ্যক। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআন আল কারীমে বলেন,

وَمَاۤ اُمِرُوْۤا اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللّٰهَ مُخْلِصِيْنَ لَـهُ الدِّيْنَ  ۙ حُنَفَآءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكٰوةَ‌ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ ؕ

তাহারা তো আদিষ্ট হইয়াছিল আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হইয়া একনিষ্ঠ ভাবে তাঁহার ‘ইবাদত করিতে এবং সালাত কায়েম করিতে ও যাকাত দিতে, ইহাই সঠিক দীন। (সূরা আল বাইয়্যিনাহ, সূরা নম্বরঃ ৯৮, আয়াত নম্বরঃ ৫)।

খ) সালাতের আরকানসমূহ (اركان):

যে ফরজ কাজগুলো সালামের মধ্যে আদায় করতে হয়, সেগুলোকে সালাতের আরকান বলা হয়। সালাত / নামাজের আরকান ৬ টি। সেগুলো হল:

১) তাকবিরে তাহরিমা বা আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করা:

তাহরীমা অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর জিকির দ্বারা নামাজ আরম্ভ করা। যেমন – আল্লাহু আকবার। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ১/২৩৮)। নিয়ত আর তাকবিরে তাহরীমার মাঝে কোনো অন্য কাজ না করা। যেমন – খাওয়া – দাওয়া ইত্যাদি। (আল আশবাহ ১/৫৮)। তাহরিমার ব্যাপারে শর্ত হলো, তা রুকুর জন্য ঝুঁকে পড়ার আগে দাঁড়ানো অবস্থায় করা। (বুখারি, হাদিস নং – ৭১৫)। আর নিয়ত তাকবিরে তাহরিমার পরে না করা। (বুখারি, হাদিস নং – ৭১৫)

তাকবির ‘আল্লাহু আকবার’ এমনভাবে বলা, যাতে নিজে শুনতে পায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কুরআন আল কারীমে বলেন,

وَرَبَّكَ فَكَبِّرْۙ

এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।

(সূরা মুদ্দাসসির, সূরা নাম্বারঃ ৭৪, আয়াত নাম্বারঃ ৩)।

মূলতঃ তাকবীরে তাহরীমা (অর্থাৎ প্রথম তাকবীর) নামাযের শর্তসমূহের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু নামাযের আভ্যন্তরিন কার্যাবলীর সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্পৃক্ত, তাই সেটিকে নামাযের ফরয সমূহের মধ্যেও গণ্য করা হয়েছে। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৫৩ পৃষ্ঠা)

(ক) মুক্তাদী “তাকবীরে তাহরীমা” এর শব্দ “أَللهُ” ইমামের সাথে বললো, কিন্তু “اَكْبَرْ” ইমামের পূর্বে শেষ করে নিলো তবে তার নামায হবে না। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৮ পৃষ্ঠা)

(খ) ইমামকে রুকূতে পেল, আর সে তাকবীরে তাহরীমা বলতে বলতে রুকূতে গেলো অর্থাৎ তাকবীর এমন সময় শেষ হলো যে, হাত বাড়ালে হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, এমতাবস্থায় তার নামায হবে না। (খুলাসাতুল ফতোওয়া, ১ম খন্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা) (অর্থাৎ এ সময় ইমামকে রুকূতে পাওয়া অবস্থায় নিয়মানুযায়ী প্রথমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলে নিন এরপর “أَللهُ اَكْبَرْ” বলে রুকূ করুন। ইমামের সাথে যদি সামান্যতম মুহুর্তের জন্যও রুকূতে অংশগ্রহণ করতে পারেন তবে আপনার রাকাত মিলে গেলো আর যদি আপনি রুকূতে যাওয়ার পূর্বেই ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে যান তবে রাকাত পাওয়া হলো না।

(গ) যে ব্যক্তি তাকবীর উচ্চারণে সক্ষম নয় যেমন- বোবা বা অন্য যে কোন কারণে যার বাকশক্তি বন্ধ হয়ে গেছে, তার জন্য মুখে তাকবীর উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়, তার অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট। (তাবঈনুল হাকাইক, ১ম খন্ড, ১০৯ পৃষ্ঠা)

(ঘ) اَلله শব্দকে اٰللهُ অর্থাৎ আলিফকে টেনে বা اَكْبَرْ কে اٰكْبَر অর্থাৎ আলিফকে টেনে বা اَكْبَرْ কে اَكْبَار অর্থাৎ ب কে টেনে পড়লো তবে নামায হবে না বরং যদি এগুলোর ভুল অর্থ জেনে বুঝে বলে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৭৭ পৃষ্ঠা) নামাযীর সংখ্যা বেশি হওয়া অবস্থায় পিছনে আওয়াজ পৌঁছানোর জন্য যেসব মুকাব্বিরগণ তাকবীর বলে থাকেন, সেসব মুকাব্বিরদের অধিকাংশই জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আজকাল اَكْبَرْ কে اَكْبَار অর্থাৎ ب কে দীর্ঘ টান দিয়ে বলতে শুনা যায়। এর ফলে তাদের নিজের নামাযও ভঙ্গ হয়ে যায় এবং তার আওয়াজে সে সব লোক নামাযের রুকন আদায় করে (অর্থাৎ কিয়াম থেকে রুকূতে যায়, রুকূ থেকে সিজদাতে যায় ইত্যাদি) তাদের নামাযও ভঙ্গ হয়ে যায়। এ জন্য না শিখে কখনো মুকাব্বির হওয়া উচিত নয়।

(ঙ) প্রথম রাকাতের রুকূ পাওয়া গেলো, তাহলে ‘তাকবীরে ঊলা’ বা প্রথম তাকবীরের সাওয়াব পেয়ে গেলো। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা)

২) কিয়াম বা দাঁড়িয়ে সালাত নামাজ আদায় করা:

নারী এবং পুরুষ উভয়কে দাঁড়িয়ে সালাত / নামাজ আদায় করতে হবে। তবে অসুস্থ হলে বসে এবং বসতে অক্ষম হলে শুয়ে ইশারায় সালাত পড়তে হবে। কিয়ামের বিষয়ে বিস্তারিত বলা যায় –

(ক) কিয়ামের নিম্নতম সীমা হচ্ছে যে, হাত বাড়ালে হাত যেন হাঁটু পর্যন্ত না পৌঁছে আর পূর্ণাঙ্গ কিয়াম হচ্ছে সোজা হয়ে দাঁড়ান। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৬৩ পৃষ্ঠা)

(খ) ততটুকু সময় পর্যন্ত কিয়াম করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত কিরাত পাঠ করা হবে। যতটুকু পরিমাণ কিরাত পড়া ফরয ততটুকু পরিমাণ দাঁড়ানোও ফরয। যতটুকু পরিমাণ ওয়াজীব ততটুকু পরিমাণ কিরাত ওয়াজীব এবং যতটুকু পরিমাণ কিরাত সুন্নাত ততটুকু পরিমাণ দাঁড়ান সুন্নাত। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৬৩ পৃষ্ঠা)

(গ) ফরয, বিতর, দুই ঈদ এবং ফযরের সুন্নাতে দাঁড়ানো ফরয। যদি সঠিক কারণ (ওজর) ব্যতীত কেউ এসব নামায বসে বসে আদায় করে, তবে তার নামায হবে না। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৬৩ পৃষ্ঠা)

(ঘ) দাঁড়াতে শুধু একটু কষ্টবোধ হওয়া কোন ওযরের মধ্যে পড়ে না বরং কিয়াম ঐ সময় রহিত হবে যখন মোটেই দাঁড়াতে পারে না অথবা সিজদা করতে পারে না অথবা দাঁড়ানোর ফলে বা সিজদা করার কারণে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হয় অথবা দাঁড়ানোর ফলে প্রস্রাবের ফোটা চলে আসে অথবা এক চর্তুাংশ সতর খুলে যায় কিংবা কিরাত পড়তে যতক্ষণ সময় লাগে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে অক্ষম হয়। এমনি দাঁড়াতে পারে কিন্তু তাতে রোগ বৃদ্ধি পায় বা দেরীতে সুস্থ হয় বা অসহ্য কষ্ট অনুভব হয় তাহলে এ সকল অবস্থায় বসে পড়ার অনুমতি রয়েছে। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৫৮ পৃষ্ঠা)

(ঙ) যদি লাঠি দ্বারা খাদিমের সাহায্যে বা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয় তবে এ অবস্থায়ও দাঁড়িয়ে নামায আদায় করা ফরয। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৫৮ পৃষ্ঠা)

(চ) যদি শুধুমাত্র এতটুকু দাঁড়াতে পারে যে, কোন মতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলতে পারবে তবে তার জন্য ফরয হচ্ছে দাঁড়িয়ে “أَللهُ اَكْبَرْ” বলা। এরপর যদি দাঁড়ানো সম্ভব না হয় তাহলে বসে বসে নামায আদায় করা। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৫৯ পৃষ্ঠা)

(ছ) সাবধান! কিছু লোক সামান্য কষ্টের (আঘাতের) কারণে ফরয নামায বসে আদায় করে, তারা যেন শরীয়াতের এ আদেশের প্রতি মনোযোগ দেয় যে, দাঁড়িয়ে আদায় করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও যত ওয়াক্ত নামায বসে বসে আদায় করা হয়েছে সবগুলো পুনরায় আদায় করে দেওয়া ফরয। অনুরূপভাবে এমনি দাঁড়াতে পারে না, তবে লাঠি বা দেয়াল কিংবা মানুষের সাহায্যে দাঁড়ানো সম্ভব ছিলো কিন্তু বসে বসে পড়েছে তাহলে তাদের নামাযও হয়নি। তা পুনরায় পড়ে নেয়া ফরয। (বাহারে শরীয়াত, ৩য় অংশ, ৬৪ পৃষ্ঠা) ইসলামী বোনদের জন্যও একই আদেশ। তারাও শরীয়াতের অনুমতি ব্যতীত বসে বসে নামায আদায় করতে পারবে না। অনেক মসজিদে বসে নামায আদায় করার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক বৃদ্ধলোক দেখা গেছে এতে বসে ফরয নামায আদায় করে থাকে, অথচ তারা পায়ে হেঁটে মসজিদে এসেছে, নামাযের পর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তাও বলে, এমন সব বৃদ্ধ লোক যদি শরীয়াতের অনুমতি ব্যতীত বসে নামায আদায় করে থাকে তবে তাদের নামায হবে না।

(জ) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও নফল নামায বসে আদায় করতে পারবে, তবে দাঁড়িয়ে আদায় করা উত্তম। যেমনিভাবে- হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আমর رضى الله عنه থেকে বর্ণিত; রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: “বসে নামায আদায়কারী দাঁড়িয়ে আদায়কারীর অর্ধেক (অর্থাৎ অর্ধেক সাওয়াব পাবে)। (সহীহ মুসলিম, ১ম খন্ড, ২৫৩ পৃষ্ঠা) অবশ্য অসুবিধার (অক্ষমতার) কারণে বসে পড়লে সাওয়াবে কম হবে না। বর্তমানে সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে,

৩) কিরাত পড়া:

কুরআন আল কারীমের কিছু অংশ পাঠ করা। কিরাত পড়া বিষয়ে বিস্তারিত বলা যায় –

(ক) কিরাত হলো, সমস্ত অক্ষরসমূহ তার মাখরাজ (উচ্চারণের স্থান থেকে) আদায় করার নাম, যেন প্রত্যেক অক্ষর অন্য অক্ষর থেকে পৃথকভাবে বুঝা যায় ও উচ্চারণও বিশুদ্ধ হয়। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা)

(খ) নীরবে পড়ার ক্ষেত্রে এতটুকু আওয়াজে পড়া আবশ্যক যে, যেন নিজে শুনতে পায়। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৭১ পৃষ্ঠা)

(গ) আর যদি অক্ষরগুলো বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করেছে, কিন্তু এত নিম্নস্বরে পড়েছে যে, নিজের কানেও শুনেনি অথচ এ সময় কোন অন্তরায় যেমন – হৈ চৈও ছিলো না, আবার কান ভারী (অর্থাৎ বধির)ও নয় তবে তার সালাত / নামায হলো না। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা)

(ঘ) যদিও নিজে শুনাটা জরুরী তবে এটার প্রতিও এতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক যে, নীরবে কিরাত পড়ার নামাযগুলোতে যেন কিরাতের আওয়াজ অন্যজনের কানে না পৌঁছে, অনুরূপভাবে তাসবীহ সমূহ আদায় কালেও এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।

(ঙ) নামায ব্যতীত যেসব স্থানে কিছু বলা বা পড়াটা নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানেও এর দ্বারা এটা উদ্দেশ্য যে, কমপক্ষে এমন আওয়াজ হয় যেন নিজে শুনতে পায়। যেমন – তালাক দেয়া, গোলাম আযাদ করা অথবা জন্তু যাবেহ করার জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নাম নেয়া। এসব ক্ষেত্রে এতটুকু আওয়াজ আবশ্যক যেন নিজের কানে শুনতে পায়। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা) দরূদ শরীফ ইত্যাদি ওযীফা সমূহ পড়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে এতটুকু আওয়াজ হওয়া উচিত যেন নিজে শুনতে পায়, তবেই পাঠ করা হিসেবে গণ্য হবে।

(চ) শুধুমাত্র বড় এক আয়াত পাঠ করা ফরয নামাযের প্রথম দুই রাকাতে ফরয, আর বিতর, সুন্নাত ও নফলের প্রত্যেক রাকাতে ইমাম ও একাকী নামায আদায়কারী সকলের উপর ফরয। (তাহতাবীর পাদটিকা সম্বলিত মারাক্বিউল ফালাহ, ২২৬ পৃষ্ঠা)

(ছ) মুক্তাদির জন্য নামাযে কিরাত পড়া জায়েয নেই। না সূরায়ে ফাতিহা, না অন্য আয়াত, না নীরবে কিরাতের নামাযে, না উঁচু আওয়াজের কিরাতের নামাযে। ইমামের কিরাতই মুক্ততাদীর জন্য যথেষ্ট। (তাহতাবীর পাদটিকা সম্বলিত মারাকিউল ফালাহ, ২২৭ পৃষ্ঠা)

(জ) ফরয নামাযের কোন রাকাতে কিরাত পড়লো না বা শুধু এক রাকাতে পড়লো তবে নামায ভঙ্গ হয়ে গেলো। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা)

(ঝ) ফরয নামাযগুলোতে ধীরে ধীরে, তারাবীতে মধ্যম গতিতে ও রাতের নফল নামাযে তাড়াতাড়ি কিরাত পড়ার অনুমতি রয়েছে। তবে এমনভাবে পড়তে হবে যেন কিরাতের শব্দ সমূহ বুঝে আসে অর্থাৎ কমপক্ষে মদের (দীর্ঘ করে পড়ার) যতটুকু সীমা কারীগণ নির্ধারণ করেছেন ততটুকু যেন আদায় হয়, নতুবা হারাম হবে। কেননা তারতীল (অর্থাৎ থেমে থেমে) সহকারে কুরআন তিলাওয়াতের আদেশ রয়েছে। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ১ম খন্ড, ৩৬৩ পৃষ্ঠা) বর্তমানে অধিকাংশ হাফিয সাহেবগণ এভাবে পড়ে থাকেন যে, মদ সমূহের আদায়তো দূরের কথা আয়াতের শেষের দু’একটি শব্দ যেমন- يَعْلَمُوْن/ تَعْلَمُوْن ছাড়া বাকী কোন শব্দই বুঝা যায় না। এক্ষেত্রে অক্ষরসমূহের উচ্চারণ শুদ্ধ হয় না বরং দ্রুত পড়ার কারণে অক্ষরগুলো একটি অপরটির সঙ্গে সংমিশ্রণ হয়ে যায় আর এভাবে দ্রুত পড়ার কারণে গর্ববোধ করা হয় যে, অমূখ হাফিয সাহেব খুব তাড়াতাড়ি পড়ে থাকেন! অথচ এভাবে কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করা হারাম ও শক্ত হারাম। (বাহারে শরীয়াত, ৩য় খন্ড, ৮৬, ৮৭ পৃষ্ঠা)

৪) রুকূ করা:

এতটুকু ঝুঁকা যাতে হাত বাড়ালে হাত উভয় হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে যায়, এটা রুকূর নিম্নতম পর্যায়। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৬৬ পৃষ্ঠা) আর পূর্ণাঙ্গ রুকূ হচ্ছে পিঠকে সমান করে সোজাসুজি বিছিয়ে দেয়া। (তাহতাবীর পাদটিকা, ২২৯ পৃষ্ঠা), রাসূলুল্লাহ্ বলেন, “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দার ঐ নামাযের প্রতি দৃষ্টি দেন না, যাতে রুকূ ও সিজদা সমূহের মাঝখানে পিঠ সোজা করা হয় না।” (মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদীস নং – ১০৮০৩)

৫) সিজদা করা:

(ক) নবী করীম বলেন, “আমাকে হুকুম করা হয়েছে সাতটি হাঁড় দ্বারা সিজদা করার জন্য। ঐ সাতটি হাড় হলো মুখ (কপাল) ও উভয় হাত, উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের পাতা আরও হুকুম হয়েছে যে, কাপড় ও চুল যেন সংকুচিত না করি।” (সহীহ মুসলিম, ১ম খন্ড, ১৯৩ পৃষ্ঠা)

(খ) প্রত্যেক রাকাতে দুইবার সিজদা করা ফরয। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ২য় খন্ড, ১৬৭ পৃষ্ঠা)

(গ) সিজদাতে কপাল জমিনের উপর ভালভাবে স্থাপন করা আবশ্যক। ভালভাবে স্থাপনের অর্থ হচ্ছে; জমিনের কাঠিন্যতা ভালভাবে অনুভূত হওয়া। যদি কেউ এভাবে সিজদা করে যে, কপাল ভালভাবে জমিনে স্থাপিত হয়নি তাহলে তার সিজদা হয়নি। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৭০ পৃষ্ঠা)

(ঘ) কেউ কোন নরম বস্তু যেমন ঘাস (বাগানের সতেজ ঘাস), তুলা অথবা কার্পেট ইত্যাদির উপর সিজদা করলো, যদি এমতাবস্থায় কপাল ভালভাবে স্থাপিত হয় অর্থাৎ কপালকে এতটুকু চাপ দিলো যে, এরপর আর চাপা যায় না, তাহলে তার সিজদা হয়ে যাবে, অন্যথায় হবে না। (তাবঈনুল হাকাইক, ১ম খন্ড, ১১৭ পৃষ্ঠা)।

৬. শেষ বৈঠকে বসা:

যে বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ, দোয়া মাছুরা পড়ে সালামের মাধ্যমে সালাত শেষ করা হয় তাকেই বলে শেষ বৈঠক। ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করা।

একে কা’দায়ে আখিরা বলা হয়। শেষ বৈঠকে বসা (যে বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ, দোয়া মাছুরা পড়ে সালামের মাধ্যমে সালাত / নামাজ শেষ করা হয় তাকেই বলে শেষ বৈঠক) ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে সালাত / নামাজ শেষ করা। অর্থাৎ নামাযের রাকাত সমূহ পূর্ণ করার পর সম্পূর্ণ তাশাহহুদ অর্থাৎ (আততাহিয়াত) পর্যন্ত পড়তে যত সময় লাগে এতক্ষণ পর্যন্ত বসা ফরয। (ফাতওয়া ই আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৭০ পৃষ্ঠা)

চার রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামাযে চতুর্থ রাকআতের পর কেউ ভুলে কা’দা করলো না, তাহলে পঞ্চম রাকাতের সিজদা না করা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে যখনই মনে পড়বে তৎক্ষণাৎ বসে যাবে আর যদি পঞ্চম রাকাতের সিজদা করে ফেলে অথবা ফজরের নামাযে দ্বিতীয় রাকাতে বসলো না তৃতীয় রাকাতের সিজদা করে নিলো কিংবা মাগরিবে তৃতীয় রাকাতে না বসে চতুর্থ রাকাতের সিজদা করে নিলো, তবে এসব অবস্থায় ফরয বাতিল হয়ে যাবে। মাগরিব ব্যতীত অন্যান্য নামাযে আরো এক রাকাত মিলিয়ে নামায শেষ করবেন। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৮৪ পৃষ্ঠা)

(ক) খুরুজে বিসুনইহী (সালামের মাধ্যমে সালাত / নামাজ শেষ করা) – অর্থাৎ কা’দায়ে আখিরাহ্ এরপর সালাম বা কথাবার্তা ইত্যাদি এমন কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করা যা নামায ভঙ্গ করে দেয়। তবে সালাম ব্যতীত অন্য কোন কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করে নামায শেষ করলে ঐ নামায পুনরায় আদায় করে দেয়া ওয়াজীব। আর যদি অনিচ্ছাকৃত ভাবে এ ধরণের কোন কাজ করা হয় তবে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। (গুনিয়াতুল মুসতামলা, ২৮৬ পৃষ্ঠা)।

পরিশেষে বলা যায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাঁর প্রিয় রাসূল কে যেভাবে সালাত / নামাজ আদায় করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ যেভাবে সালাত / নামাজ আদায় করেছেন তাঁর প্রিয় সাহাবায়ে কেরামদের সালাত / নামাজ আদায় করা শিখিয়েছেন আমরা সকলেই যেন সেভাবে খুশু খুযুর সাথে সালাত / নামাজ আদায় করতে পারি, আমীন।

তথ্য সূত্রঃ

১. দৈনিক কালের কণ্ঠ

২. দৈনিক যুগান্তর

৩. আল ফিকহ্ – https://www.al-feqh.com/bn/%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9C-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4

আরও পোস্ট দেখুন:

Comments (2)

[…] সালাতের আহকাম ও আরকান সম্পর্কে পড়তে চাইলে এখানে ট্যাপ/প্রেস করুন। […]

[…] সালাতের আহকাম ও আরকান […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!